28 C
Dhaka
Monday, July 13, 2026
Homeআন্তর্জাতিকভেনেজুয়েলার পর কি ইরান, আলি খামেনি কি মস্কো পালানোর পরিকল্পনা করছেন

ভেনেজুয়েলার পর কি ইরান, আলি খামেনি কি মস্কো পালানোর পরিকল্পনা করছেন

Date:

Related stories

‘এলআরবির স্বীকৃতিতেই বেশি আনন্দ পেতেন আইয়ুব বাচ্চু’

বাংলা রকসংগীতের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু মরণোত্তর একুশে পদক পাচ্ছেন।...

‘নেতৃত্ব সৎ-গণতান্ত্রিক হলে, দেশের প্রতি ভালোবাসা থাকলে কত বড় পরিবর্তন হয় দেখলাম’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন,...

‘১০০ টেস্ট খেলতে হলে আমাদের কাউকে সম্ভবত ৫০ বছর খেলতে হবে’

২০১৮ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর ৭ বছরে আয়ারল্যান্ড...

গবেষণায় পাকিস্তানের সহযোগিতা চাইলেন তথ্য উপদেষ্টা

পূর্ব পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরের বিভিন্ন আর্থসামাজিক ঘটনাবলি নিয়ে...

ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্য: নগর শৃঙ্খলায় বড় চ্যালেঞ্জ

ঢাকার সড়ক ব্যবস্থা বহুদিন ধরেই যানজট, অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতার...

ঘটনা ঘটেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে। এর প্রভাব পড়েছে প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার দূরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে। গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলা থেকে সেই দেশের রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণ করে মার্কিন সেনারা। তাই ভয়ে আছে ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরান সরকারও।

কারাকাসে অপ্রত্যাশিত মার্কিন হামলার সপ্তাহখানেক আগে তেহরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। ইরানে মার্কিন ডলারের দাম আরও বেড়ে যাওয়ায় প্রথমে ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নেমে ক্ষোভ প্রকাশ করে। পরে, একে একে যোগ দেয় সর্বস্তরের মানুষ।

আজ ৭ জানুয়ারি ইরানের বাইরে থেকে পরিচালিত হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, গত ১০ দিনের বিক্ষোভে ইরানে অন্তত ৩৬ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৪ জন বিক্ষোভকারী ও ২ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। আহত হয়েছেন ৬০ জনের বেশি। গ্রেপ্তার অন্তত ২ হাজার ৭৬ জন।

ইরানের ৩১ প্রদেশের মধ্যে ২৭টিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে বলেও সংবাদ প্রতিবেদনগুলোয় বলা হচ্ছে। আরও বলা হয়—চরম মূল্যস্ফীতির জেরে বিক্ষোভ শুরু হলেও তা ক্রমশ সরকারবিরোধী হয়ে উঠেছে।

একই দিনে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান সরকার নিহতদের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ না করলেও বলেছে যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৩ সদস্য নিহত হয়েছেন।

সংবাদ বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ২০২২ সালের পর আবারও গণবিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে ইরান। সেসময় সরকারি বাহিনীর হাতে তরুণ মাশা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শাসকবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল। এবারের বিক্ষোভ-প্রতিবাদের কারণ মূলত দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতি। প্রতিবাদকারীরা বলছেন, শাসকদের দুর্বলতম মুহূর্তে আঘাত করতে হবে।

এদিকে, ইরান সরকার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি জনগণকে অর্থনৈতিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। এ ছাড়াও, বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘ইসরায়েলি ও মার্কিন চরের’ তকমা দিয়ে তাদের দমনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনগুলো বলা হয়েছে।

ইরানে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই দেশ দুটি গত বছর জুনে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সামরিক অভিযান চালিয়েছিল।

২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরুর পর নতুন বছরের ৩ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানান যে, ইরান সরকার যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে থাকে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের উদ্ধারে ব্যবস্থা নেবে। অর্থাৎ, ইরানের সরকারবিরোধীদের পক্ষে আছে ওয়াশিংটন।

অন্যদিকে, ইসরায়েল বলেছে যে তাদের লোকজন ইরানে আছে। প্রয়োজনে তারা বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করবে। ট্রাম্পের সহায়তা আশ্বাসের পরদিন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকে জানান যে, ইরানের জনগণের মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে তিনি একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।

স্বভাবতই, ইরানের শাসকবিরোধী বিক্ষোভে এই দুই দেশের শীর্ষ নেতার সমর্থনকে তেহরান তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ইরান সরকার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, বিদেশি রাষ্ট্রের এমন হস্তক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।

কিন্তু, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সেনাদের হস্তক্ষেপ যেন তেহরানের সব হুঁশিয়ারিকে ‘হালকা’ করে দিয়েছে।

গত বছর ৩১ ডিসেম্বর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৮ ডিসেম্বর ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের দাম এতটাই পড়ে যায় যে, সেদিন এক ডলারের বিনিময়ে রিয়াল ছিল ১৪ লাখ ২০ হাজার। গত ৬ মাসে রিয়ালের দাম ৫৬ শতাংশের বেশি কমেছে।

শুধু তাই নয়, গত বছরে একই সময়ের তুলনায় ইরানে খাবারের দাম বেড়েছে গড়ে ৭২ শতাংশ।

এমন পরিস্থিতিতে ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতি যেমন ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে, তেমনি দেশটির জনগণের আর্থিক দুর্দশা সব সীমা অতিক্রম করে চলেছে।

গত ৩ জানুয়ারি একই দৈনিকের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—’আমাদের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই’। বিক্ষুব্ধ ইরানিরা ক্ষমতাসীনদের এখনই সরানোর দাবি জানাচ্ছেন বলেও শিরোনামে উল্লেখ করা হয়।

তবে ইরানের বিক্ষোভকারীরা সংবাদমাধ্যমগুলোকে জানায়, তাদের বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই। তারা ‘সিরিয়া’ বা ‘লিবিয়া’ হতে চায় না। তাদের ভাষ্য, সিরিয়া ও লিবিয়ার সরকারবিরোধী গণআন্দোলন বিদেশি হস্তক্ষেপের কারণে গৃহযুদ্ধের রূপ নিয়েছে। দেশ দুইটি আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।

তাই ইরানে বিদেশি হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই কাম্য নয় বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আবার ইরানের সরকারপন্থিদের কেউ কেউ সংবাদমাধ্যমগুলোকে বলেছেন যে তাদেরকে ভেনেজুয়েলা ভাবলে মার্কিনিরা ভুল করবে। তারা ইরানের বিক্ষোভকারীদের উদ্ধারের বিষয়ে ওয়াশিংটনের সহায়তার আশ্বাস নিয়ে উপহাস করেছেন।

গত ২ জানুয়ারি সরকারি প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভির বরাত দিয়ে তেহরান টাইমস জানায়, ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানি মার্কিনিদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমেরিকার জনগণের জানা দরকার, ট্রাম্প আগুন নিয়ে খেলছেন। তাদের সেনাদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রাখা উচিত।’

ইরানে বিদেশিরা হস্তক্ষেপ করলে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে যাবে বলেও হুঁশিয়ার করেছেন লারিজানি।

আজ ৭ জানুয়ারি সিএনএনের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়, ভেনেজুয়েলা ট্রাম্পের হস্তগত হওয়ায় অস্বস্তিতে পড়েছে ইরান। প্রতিবেদন অনুসারে, কারাকাসে মার্কিন সেনাদের সফল অভিযানের পর তেহরানের ক্ষমতাসীনদের কপালে ভাঁজ পড়েছে।

এতে আরও বলা হয়, অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করছেন যে ভেনেজুয়েলায় সাফল্যের পর ইরানের ওপর হোয়াইট হাউসের মনোযোগ বেড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ৮৬ বছর বয়সী অসুস্থ আলি খামেনিকেও কি একই পরিণতির মুখে পড়তে হবে?

সিএনএনের প্রতিবেদন বলছে—ইরান ও ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বমঞ্চে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান নিয়ে আছে। এই দুই দেশে আছে বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল ও গ্যাস। এই দুই দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের কঠোর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে।

বিদেশি অবরোধ ও নিজ দেশে অব্যবস্থাপনার কারণে এই দেশ দুটির অর্থনীতি প্রায় ধসে পড়েছে। ট্রাম্প চান দেশ দুটিতে সরকার বদল হোক। তিনি কারাকাসের পর এবার তেহরানের ওপর চাপ বাড়াবেন—এমনটিই ভাবছেন বিশ্লেষকরা।

গত বছর ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রতিবাদে তাদের দোকান বন্ধ করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করেন। মূলত রিয়ালের দরপতনের কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় এই বিক্ষোভ শুরু হয়। তারপর তা ধীরে ধীরে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

বিক্ষোভকারীরা তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের দায়ী করছেন। তাদের মতে, সরকারের অব্যবস্থাপনা তাদের দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসকদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে সেই শাসনব্যবস্থা পালটে ফেলার দাবি তুলছেন।

অর্থাৎ, বিক্ষোভকারীদের দাবি তাদের দুর্দশার কারণে সরকারকে সরতে হবে। তারা তাদের প্রধান নেতা আলি খামেনির বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে, ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানায়, ‘আয়াতুল্লাহ খামেনি মস্কো পালানোর পরিকল্পনা করছেন’।

সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা তেহরান থেকে পালানোর পথ নিয়ে পরিকল্পনা করেছেন। তার নিরাপত্তা বাহিনী যদি জনক্ষোভ প্রশমনে ব্যর্থ হয় তাহলে তিনি মস্কোর পথে উড়াল দেবেন।

বিশ্লেষকদের বিশ্বাস, বর্তমান বিশ্ব-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইরানি নেতাদের আশ্রয়ের জন্য রাশিয়াই এখন একমাত্র দেশ। তাদের মতে, ইরানের আয়াতুল্লাহ রাশিয়ার শাসক ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশংসা করেন। রুশ সংস্কৃতির সঙ্গে ইরানি সংস্কৃতির মিল আছে। এসব কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলে ইরানি নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি রাশিয়াকেই প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেবেন।

দ্য টাইমসের বরাত দিয়ে অপর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট জানায়, পালানোর সময় আলি খামেনির সঙ্গে পরিবারের সদস্য ও রাজনৈতিক সহযোগীদের মধ্যে ২০ জন যেতে পারেন। এই দলে খামেনির ছেলে ও উত্তরাধিকার মোজতবা থাকবেন।

তবে এই সিদ্ধান্তকে ‘দ্বিতীয় ভাবনা’ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এক্ষেত্রে স্মরণ করা যেতে পারে যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত নেতা বাশার আল আসাদ গণঅভ্যুত্থান ও গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। গত বছরের ৮ ডিসেম্বর ইরান-সমর্থিত এই সিরীয় নেতা পালিয়ে মস্কো যান। এর মাস খানেকের মধ্যে একই পরিস্থিতি ইরানে তৈরি হতে যাচ্ছে কি না, এখন তা দেখার বিষয়।

Latest stories