‘আগুন লাগছে! সব শেষ!’ হাউমাউ করে মায়ের কান্নার শব্দ। মেয়েকে বলছেন, ‘টিউশনি করা লাগবো না, মা তুই তাড়াতাড়ি আয়! আমাদের ছোটু তো ঘরের মধ্যে ঘুমানো। ওরে বের করতে পারছি না আগুনের কারণে, ওরে বাঁচা!’
মহাখালীর করাইল বস্তিতে প্রতি বছর এভাবেই কাঁদে এই মানুষগুলো। এখানে যেন নিয়ম করেই আগুন লাগে।
করাইলে জীবনযাপন মানেই অনিশ্চয়তার ওপর প্রতিদিনের ভারসাম্য ধরে রাখা। এখানে টিনের ছাউনি আর বাঁশের খুঁটির নিচে শতাধিক ঘরে মানুষ তাদের স্বপ্নকে এমন শক্ত করে আঁকড়ে রাখে, যেন এটাই তাদের একমাত্র মূলধন। অথচ প্রতি বছর সেই স্বপ্নই আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
আগুন যখন ঝুপড়ি ঘরগুলো গ্রাস করে, তখন শুধু ঘরবাড়ি নয়—পুড়ে যায় কোনো এক মায়ের বছরের পর বছর ধরে জমিয়ে রাখা সামান্য সঞ্চয়; পুড়ে যায় স্কুলে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে থাকা শিশুটির বই-খাতা; পুড়ে যায় এক বৃদ্ধের জরুরি ওষুধ; পুড়ে যায় পরীক্ষার আগে সপ্তাহব্যাপী প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীর নোট। ধোঁয়ার কালো আবরণ যখন পুরো আকাশ ঢেকে দেয়, তখন সেই ধোঁয়ার ভেতরেই মিলিয়ে যায় মানুষের শেষ আশ্রয়টুকু।
তারপর?
তারপর শহর কিছু সময়ের জন্য সরব হয়ে ওঠে। টেলিভিশন ক্যামেরা আসে, প্রতিবেদকরা মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের কষ্ট তুলে ধরেন। কিছু ত্রাণ—চাউল, ডাল, কম্বল, পুরোনো কাপড়—আসতে থাকে। সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ দিন—তারপর শহর তার স্বাভাবিক ব্যস্ততায় ফিরে যায়। সংবাদ স্ক্রলে ‘করাইল বস্তিতে আগুন’ শিরোনামটি ঢাকা পড়ে যায়। মানুষ ভুলে যায় সেই ভয়াবহ আর্তনাদ।
কিন্তু বস্তির মানুষ ভুলতে পারে না
স্বপ্ন আবার বুনতে শুরু সব হারানো এই মানুষগুলো। তারা আবার ভাঙা টিন কুড়িয়ে আনে, আবার বাঁশ কিনে আনে, আবার গোছগাছ করে, নতুন করে ঘর দাঁড় করায়। আবার স্বপ্নের ভাঙা অংশগুলো জোড়া লাগাতে বসে।
অথচ প্রশ্নগুলোর উত্তর কোথাও মেলে না—আগুন কেন লাগে? প্রতি বছর কেন? কে দায়ী? তদন্ত প্রতিবেদন কোথায়? কেন সেগুলো কোনো এক ড্রয়ারে ধুলোমাখা হয়ে নির্বাসিত থাকে? কেন রাষ্ট্র এই প্রশ্নগুলোর সামনে নীরব?
রাষ্ট্র কোথায় দাঁড়িয়ে? এই প্রশ্নটি সমাজের বাতাসে বছরের পর বছর ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু যেন কারও কানে পৌঁছায় না। রাষ্ট্র কি শুধু বস্তিবাসীর সংখ্যা গুনে রাখার যন্ত্র? তাদের দগ্ধ চিৎকার কি রাষ্ট্রের দেয়ালে কোনোদিন প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে না?
‘বস্তিতে আগুন লাগে, শহর তো আর পুড়ে না’। কিন্তু সত্যিই কি শহর অক্ষত থাকে? নাকি প্রতিটি আগুনের পর একটু একটু করে পুড়ে যায় আমাদের মানবিকতা, বিবেক, যৌথ দায়িত্ববোধ?
যে করাইলকে ‘বস্তি’ শব্দে সংকুচিত করে রাখা হয়, সেখানে থাকেন রিকশাচালক, গার্মেন্টস কর্মী, ডেলিভারি কর্মী, বাস হেলপার, গৃহকর্মী। এই মানুষগুলোর শ্রমে এই শহর প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সচল। অথচ তাদেরই ঘরই সবচেয়ে অনিরাপদ, তাদের স্বপ্নই সবচেয়ে সহজে দগ্ধ হয়।
তাহলে রাষ্ট্রের ভূমিকা কোথায় হওয়া উচিত?
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল আগুন নেভানোর পর শুকনো ত্রাণ দেওয়া নয়। এর চেয়ে বহুগুণ বড় ও সুসংগঠিত দায়িত্ব রয়েছে।
১. নিরাপদ আবাসন নীতিমালার বাস্তবায়ন
বস্তিকে ‘অস্থায়ী’ ভেবে ফেলে রাখলে সমাধান হয় না। রাষ্ট্র চাইলে—
এমন নানা উদ্যোগ নিয়ে স্থায়ী সমাধানের পথ খুলে দিতে পারে। করাইলের মানুষ দয়া চায় না, তারা চায় নিরাপদে থাকার অধিকার।
২. ‘বস্তি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’
ঢাকায় বস্তিগুলো উন্নয়নের জন্য পৃথক, শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল একটি কর্তৃপক্ষ থাকা জরুরি। তারা যে কাজগুলো করতে পারে তা হলো—
৩. স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতা
প্রতিবার আগুনের ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়। কিন্তু তার প্রতিবেদন আর প্রকাশ পায় না। যদি রাষ্ট্র—
তাহলে আগুনের পুনরাবৃত্তি কমে আসবে আশা করা যায়।
৪. সামাজিক নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন শক্তিশালী করা
সরকার চাইলে—
এমন নানা সুবিধা চালু করতে পারে। এতে মানুষের পক্ষে নতুন করে ঘর বানানো অন্তত সম্ভব হবে। অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত ফিরতে পারবে স্বাভাবিক জীবনে।
স্বপ্ন কি বস্তিতে জন্ম নিতে পারে?
স্বপ্ন দেখার অধিকার সবার আছে—করাইলের অন্ধকার গলির এক কোণে বসে থাকা শিশুটির বইয়ের পাতায়, এক মায়ের নীরব প্রার্থনায়, এক বাবার প্রতিদিন ভোরে রোজগারের উদ্দেশে বেরিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তায়। স্বপ্ন মরে না—মরে স্বপ্নের নিরাপত্তা। স্বপ্ন পুড়ে যায় আগুনে, আর আগুনের চেয়েও বেশি পুড়ে যায় রাষ্ট্রের উদাসীনতায়।
উত্তর খুব স্পষ্ট
স্বপ্ন বাঁচাতে হলে আগে মানুষকে বাঁচাতে হবে। করাইলের মানুষ দয়া চায় না, চায় অধিকার, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি। যে শহর তার শ্রমিককে নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ, সেই শহর সভ্যতার দাবি করতে পারে না।
করাইলের প্রতিটি পুড়ে যাওয়া রাত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সেখানে মানুষের ঘর নিরাপদ নয়। আর যেখানে মানুষের ঘর নিরাপদ থাকে না সেখানে কোনো উন্নয়ন, অগ্রগতি, আলো টিকে থাকে না।
যতদিন রাষ্ট্র এই আগুনকে ‘বস্তির আগুন’ বলে পাশ কাটিয়ে যাবে, ততদিন শুধু করাইল পুড়বে না, পুড়ে ধ্বংস হতে থাকবে আমাদের মানবতার স্তম্ভ।
আমরা প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ জায়গা থেকে এই শহরকে নিরাপদ বসবাসের কেন্দ্র করতে পারি, নিজেরা নিজেদের পাশে যেকোনো পরিস্থিতিতে শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে পারি। শুধু দরকার প্রতিটি মানুষের স্বদিচ্ছা!
জুবাইয়া ঝুমা, পিআর প্রফেশনাল