34 C
Dhaka
Thursday, August 27, 2026
Homeমতামতনিরাপত্তার নামে ঢাবির ছাত্রী হলে কেন এই নিয়ন্ত্রণ?

নিরাপত্তার নামে ঢাবির ছাত্রী হলে কেন এই নিয়ন্ত্রণ?

Date:

Related stories

মে মাসে রপ্তানি কমেছে ৭ শতাংশ

প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের চালান কমে যাওয়ার কারণে...

বিজয়-রাশমিকার বিয়ের ভেন্যুর এক দিনের ভাড়া কত?

দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় মুখ রাশমিকা মান্দানা ও বিজয়...

ইরানে বিক্ষোভে নিহত ২ হাজার, দাবি সরকারি কর্মকর্তার

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় দুই...

‘পোস্টাল ব্যালটে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কয়েকটি দলের প্রতীক আগে দেওয়া হয়েছে’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দাবি করেছেন,...

২ দিনেই শেষ হওয়া পার্থ টেস্টের পিচকে আইসিসির সর্বোচ্চ মূল্যায়ন

মাত্র দুই দিনেই নিষ্পত্তি হওয়া অ্যাশেজের প্রথম টেস্টের পিচকে...

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলোতে একটি নিয়ম চালু আছে। রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত হলগেট বন্ধ থাকে। রাত ২টার পর প্রতিটি ভবনের নিচের গেটও তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। এই নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুললেই কর্তৃপক্ষ বলে নিরাপত্তার কথা। কিন্তু, বাস্তবে তালাবদ্ধ করে কারো নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, হয় শুধু নিয়ন্ত্রণ।

হলে থাকা অনেক ছাত্রী নিজের খরচ জোগানোর তাগিদে টিউশনি করেন, খণ্ডকালীন চাকরি করেন। যানজটে বা অন্য কোনো কারণে ফিরতে দেরি হলে, রাত ১০টা পার হয়ে গেলেই তাদের হলে ঢুকতে সমস্যা হয়, গেটে দারোয়ানের অপমান সহ্য করতে হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যারা থাকেন, বাড়ি ফেরার সময় তারা ভোরের বাস বা ট্রেন ধরতে পারেন না। বাড়ি থেকে ফেরার সময় ভোরে বা বেশি রাতে বাস বা ট্রেন থেকে নামলেও হলে ঢুকতে পরেন বিড়ম্বনায়, এমনকি অনেকে ঢুকতেও পারেন না।

২০২২ সালের একটা ঘটনা আমার মনে আছে। আমার বাড়ি উত্তরবঙ্গে। ঈদের পর বাবা আমাকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। প্রায় ১৬ ঘণ্টার যানজট পেরিয়ে রাত সাড়ে ১১টায় আমরা হলগেটে পৌঁছাই। বাবা আর আমি অসংখ্যবার অনুরোধ করলেও আমাকে হলে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বাবার বারবার অনুরোধের পর হাউজ টিউটর অনুমতি দেন। সদ্য প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে সেদিন আমি বুঝিনি, এটা আসলে হল কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা। এমন অভিজ্ঞতা হলে থাকা বেশিরভাগ ছাত্রীরই আছে।

২০২৪ সালে মুগদা হাসপাতাল থেকে একজন মুমূর্ষু রোগীকে রক্ত দিয়ে ফেরার সময়ও রাত ১১টা বেজে যাওয়ায় একই ধরনের হয়রানির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল আমাকে। এমন পরিস্থিতিতে পড়লে ঠিক বোঝা যায়, রাত ১০টার নির্দিষ্ট সময়সীমা নারী শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে কতটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই নিয়মের বিরুদ্ধে এখন প্রশ্ন তুলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা। অধিকার সচেতন নারী শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম ‘অবরোধবাসিনী’ ছাত্রী হলের সান্ধ্য আইন ও বিভিন্ন বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। তাদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে বৈষম্যমূলক সান্ধ্য আইন বাতিল করে ২৪ ঘণ্টা যাতায়াতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বৈধ আইডি কার্ড প্রদর্শন করে সকল ছাত্রীকে যেকোনো হলে প্রবেশ ও অনুমতি সাপেক্ষে রাত্রিযাপনের সুযোগ দেওয়া এবং নারী স্বজনদের হলে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

শিক্ষার্থীদের আপত্তি শুধু রাত ১০টার পর হলে ঢুকতে না পারা নিয়ে নয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী শিক্ষার্থী কেন নিজের চলাফেরার সময় নির্ধারণ করতে পারবেন না, সেই প্রশ্নও উঠছে।

রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী মুনতাহা রহমান মনামী বলেন, ‘স্বাধীনতা মানে শুধু বিপদে পড়লে দরজা খোলার অনুমতি পাওয়া নয়। স্রেফ ইচ্ছা করছে বলেই বাইরে বের হতে পারার সাধারণ অধিকার থাকা চাই। মাঝরাতে একজন ছেলে অনায়াসে বের হতে পারছে, অথচ একজন প্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রী হিসেবে আমি পারছি না। মূল বৈষম্যটা শুরু এখান থেকেই।’

নিরাপত্তার নামে এই বিধিনিষেধ যে বৈষম্য তৈরি করছে, সেটিও শিক্ষার্থীদের অন্যতম অভিযোগ। সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থী নুসরাত রুষা বলেন, ‘আমি মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে প্রচলিত সান্ধ্য আইন মধ্যযুগীয় নিষেধাজ্ঞার মতো। সভ্য সমাজে এখনো কেন এমন নিয়ম থাকবে? তাও আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে? অবিলম্বে সান্ধ্য আইন বাতিল করা হোক।’

রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী নাইমা জান্নাতের মতে, এই নিয়মের প্রভাব শিক্ষার্থীদের সুযোগের ওপরও পড়ে। ‘ঢাবির মেয়েদের হলগুলোর সান্ধ্য আইন মূলত নিরাপত্তার নামে মেয়েদের চলাচল ও সুযোগকে সীমিত করে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরুষ শিক্ষার্থীরা যেখানে টিউশনি, ক্লাবের বিভিন্ন কার্যক্রম, অনুষ্ঠান ও সামাজিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে নির্দ্বিধায় যোগ দিতে পারেন, সেখানে নারী শিক্ষার্থীরা এই সান্ধ্য আইনের কারণে সুযোগগুলো থেকে বঞ্চিত হন।’

সান্ধ্য আইনের কারণে টিউশনি, খণ্ডকালীন চাকরি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম শেষে হলে ফেরাও অনেকের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে। রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী রাইসা মনে করেন, নিয়ম থাকলেও সেটি আরও নমনীয় করা সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘অনেক সময় টিউশন বা ডিপার্টমেন্টের কাজে মেয়েদের ফিরতে দেরি হতে পারে। হলে লেট পারমিশন নিতে হয়। কিন্তু আমাদের হলে লেট পারমিশন নেওয়ার প্রক্রিয়াটা বেশ ঝামেলার পাশাপাশি হলের দাদুদের (দারোয়ান) ব্যবহারও ভালো না। হলের আইন যদি শিথিল করা হয় বা ১১টা পর্যন্ত করা হয় এবং আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা হয়, সেটা ভালো হবে।’

তার মতে, নিরাপত্তার জন্য শিক্ষার্থীদের চলাচল পুরোপুরি সীমিত না করে একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ‘একটি মেয়ে কখন আসছে, কখন যাচ্ছে, সেটা যেন কর্তৃপক্ষ জানে এবং এন্ট্রির ব্যবস্থা থাকে। সবকিছু নথিবদ্ধ থাকতে পারে। প্রয়োজনে পরিবারকেও অবগত করা যেতে পারে।’

জরুরি পরিস্থিতিতেও এই নিয়ম শিক্ষার্থীদের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রোকেয়া হলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘অসুস্থতা কিংবা বিপদের তো কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকে না। অথচ এমনভাবে মেয়েদের হলের নিয়মগুলো তৈরি করে রাখা হয়েছে যেন রাতে মেয়েদের কোনো ধরনের সমস্যা হতেই পারে না। যদি কোনোভাবে হয়েও যায়, হাজারটা জটিলতার ভেতর দিয়ে হাউজ টিউটরদের অনুমোদন নিতে হয়। এসব কঠোর নিয়ম শিথিল হলে আবাসিক ছাত্রীদের হয়রানি অনেকটাই লাঘব হবে।’

সান্ধ্য আইনের প্রভাব পড়ছে ছাত্রীদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও। কনসার্ট কিংবা সাংস্কৃতিক যেকোনো আয়োজন শেষ হতে বেশি রাত হলে অনেক নারী শিক্ষার্থী সেখানে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।

কুয়েত মৈত্রী হলের শিক্ষার্থী ফারজানা আমিন বলেন, ‘ক্যাম্পাসে অনেক সময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকে, যেগুলো শেষ হতে রাত ১০টা পার হয়ে যায়। অনেক সময় রাতে কনসার্ট থাকে। এরকম বাঁধাধরা নিয়মের জন্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মেয়েদের অংশগ্রহণ কম লক্ষ্য করা যায়। কারণ, দিনশেষে সবার একটা ভয় থাকে যে, অমুক অনুষ্ঠানে গেলে হয়তো রাতে হলে ফিরতে দেরি হয়ে যাবে।’

সান্ধ্য আইন তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ে হলের গেট বন্ধ হওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারী শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চলাচলের অধিকার, কাজ, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সমানভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ।

নিরাপত্তা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যদি শিক্ষার্থীদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। শিক্ষার্থীদের দাবি, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু সেই নিরাপত্তার শর্ত হিসেবে স্বাধীন চলাচলের অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।

 

আনিকা তাহসিন হাফসা: আবাসিক শিক্ষার্থী, রোকেয়া হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ট্রেইনি সাব-এডিটর, আর্টস অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট, দ্য ডেইলি স্টার।
[email protected]

Latest stories