23 C
Dhaka
Monday, April 6, 2026
Homeমতামতবক্তব্য যেন হয় নাগরিকের বাস্তব কণ্ঠ

বক্তব্য যেন হয় নাগরিকের বাস্তব কণ্ঠ

Date:

Related stories

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম ইপিএ সই, ৭ হাজারের বেশি পণ্য রপ্তানিতে মিলবে শুল্কমুক্ত সুবিধা

বাংলাদেশ ও জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ (ইপিএ) স্বাক্ষর...

সোনালি দিনের নায়িকা সুমিতা দেবী

ঢাকাই সিনেমার ইতিহাসে অনন্য নাম সুমিতা দেবী। সোনালি দিনের...

আরেক দুর্নীতির মামলায় ইমরান খান ও বুশরা বিবির ১৭ বছরের কারাদণ্ড

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এবং তার স্ত্রী বুশরা...

নারায়ণগঞ্জে ছাত্রদল নেতার ‘হাত-পা ভাঙা’র হুমকি বিএনপি প্রার্থীর

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে এক ছাত্রদল নেতার 'হাত-পা ভেঙে দিয়ে' এলাকাছাড়া...

ইউরোপীয় বাছাইপর্ব: শেষ রাউন্ডে কারা নিশ্চিত করতে পারে বিশ্বকাপের টিকিট

২০২৬ বিশ্বকাপের ইউরোপীয় বাছাইপর্বের শেষ রাউন্ড অনুষ্ঠিত হবে রোববার,...

একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে চাওয়া খুব বেশি নয়—শোনা হোক, বোঝা হোক, আর সত্যটা বলা হোক। কিন্তু যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসা বক্তব্যগুলো আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে মেলে না, তখন সেই অমিলটা কেবল বিরক্তি নয়, আস্থার নীরব ক্ষয় শুরু করে।

সাম্প্রতিক সময়েও আমরা এমন বেশকিছু বক্তব্য শুনেছি যেখানে নাগরিকদের প্রকৃত দুর্ভোগের প্রতিফলন অনুপস্থিত।

সড়কে মৃত্যু কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে থাকে ভেঙে যাওয়া একটি পরিবার, থেমে যাওয়া একটি ভবিষ্যৎ। যে মা সন্তান হারান, যে পরিবার প্রিয়জনকে হারিয়ে নিঃশব্দ শোক বয়ে বেড়ায়, তাদের সেই ক্ষতি ও ক্ষতর গভীরতা কোনো সংখ্যায় মাপা যায় না।

একইভাবে, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার অভাবে যখন হাসপাতালের করিডোরে শিশু থেকে বয়স্কদের অসহায় আহাজারি ভেসে আসে, তখন প্রশ্ন জাগে—এই বেদনা কি সত্যিই নীতিনির্ধারকদের হৃদয়ে পৌঁছায়? নিদেনপক্ষে তাদের কর্ণকুহরে আঘাত করে?

বাজারে বাড়তি দামে নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে যে মানুষটি মাসের হিসাব মেলাতে পারেন না, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় দিশেহারা হয়ে পড়া তরুণ, কিংবা নগর জীবনের চাপ সামলাতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করা মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্পে কোনো অলংকার নেই। আছে কেবল টিকে থাকার এক অবিরাম চেষ্টা, আর প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে পড়ার অদৃশ্য ক্লান্তি।

এসব বাস্তবতার চিত্র যেন সরকারি বক্তব্যে জায়গা পাচ্ছে না। বরং সেখানে যা উঠে আসছে, বাস্তবতার সঙ্গে তা খাপ খায় না।

এই ফারাকটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। কারণ, রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক কেবল আইন বা নীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এটি দাঁড়িয়ে থাকে বিশ্বাসের ওপর। সেই বিশ্বাস গড়ে ওঠে তখনই, যখন মানুষ অনুভব করে, ‘আমার কথা বলা হচ্ছে, আমার সমস্যাটা বোঝা হচ্ছে।’

কিন্তু যখন তারা সেটা শুনতে পায় না, উল্টো এমন কথা বলা হয় যেখানে তাদের বাস্তবতাকেই অস্বীকার করা হয়, তখন সেই বিশ্বাসে চিড় ধরে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক বক্তব্যে বর্তমানের দায় এড়াতে অতীতের দিকে আঙুল তোলা হয়। পূর্ববর্তী সরকারের সমালোচনা রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হতে পারে, কিন্তু সেটি যদি কেবল ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা আর কার্যকর বিষয় থাকে না।

নাগরিকেরা অতীতের গল্প শুনতে চায় না। তারা জানতে চায় আজ কী হচ্ছে, কাল কী হবে।

এখানেই একজন মন্ত্রীর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কেবল তথ্য নয়; ‘রাষ্ট্র আপনার পাশে আছে, আপনার কষ্ট আমরা বুঝি’, এমন বার্তা চায় মানুষ। কিন্তু যখন সেই বার্তাটি অস্পষ্ট হয়ে যায়, কিংবা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন উল্টো বার্তা দেয় যে রাষ্ট্র হয়তো নাগরিকের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই দূরত্ব তৈরি হওয়া সরকারের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

ইতিহাস সাক্ষী, নাগরিকের আস্থা একবার ভেঙে গেলে তা পুনরায় ফিরে পাওয়া অত্যন্ত দুরূহ। এটি কোনো অবকাঠামো নয় যে আবার তৈরি করে নেওয়া যাবে। মানুষের আস্থা একটি অনুভূতি, যা সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠে, আবার ভেঙেও পড়তে পারে।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করে তুলেছে। একটি বক্তব্য কয়েক মিনিটের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তারা তা বিশ্লেষণ করে, নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলায় এবং খুব দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়।

ফলে একটি অসংযত বা বাস্তবতা বিবর্জিত বক্তব্য এখন আর ছোট কোনো ভুল থাকে না, বরং বড় ধরনের জনমত তৈরির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সমাধান কী?

এর সমাধান হয়তো খুব জটিল নয়, কিন্তু বাস্তবায়ন করা কঠিন।

প্রথমত, বাস্তবতাকে স্বীকার করার সাহস থাকতে হবে। গড়পড়তায় ‘সব ঠিক আছে’ বলার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী বার্তা হলো, সমস্যা থাকলে তা স্বীকার করে নেওয়া এবং সমাধানের প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনে সবাইকে সম্পৃক্ত করা। এই সততা মানুষকে আশ্বস্ত করে।

দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন সংযম। ক্ষমতা যত বড় হয়, কথার দায়িত্বও তত বড় হয়। প্রতিটি শব্দের প্রভাব আছে। কথা মানুষকে আশ্বস্তও করতে পারে, আবার বিচলিতও করতে পারে। তাই বক্তব্য হওয়া উচিত মাপা, চিন্তাশীল ও তথ্যভিত্তিক।

তৃতীয়ত, শুনতে হবে। কেবল বলে গেলে হবে না। যদি নীতিনির্ধারকেরা মাঠপর্যায়ের মানুষের কথা শোনেন, তাদের অভিজ্ঞতা বোঝেন, তাহলে সেই বোঝাপড়া তাদের বক্তব্যেও প্রতিফলিত হবে এবং এর মাধ্যমে মানুষ আরও আশ্বস্ত হবে।

নাগরিককে ‘শ্রোতা’ হিসেবে নয়, ‘অংশীদার’ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রের সাফল্য বা ব্যর্থতা এককভাবে সরকারের নয়। সরকার রাষ্ট্রের একটি অংশ এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকও রাষ্ট্রের অংশ। কাজেই একটি অংশকে কেবল শ্রোতা মনে করলে সফলতা পাওয়া কঠিন।

বর্তমান বাস্তবতায় সরকার নানা চ্যালেঞ্জের মুখে—অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ সমস্যা। এসব মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে জনগণ ও জনআস্থা। সেই আস্থা ধরে রাখতে চাইলে বক্তব্যের ভাষার প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।

সময় এখন কথার চেয়ে বেশি কাজের; এমন এক শাসনের, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তে মানুষের প্রতিচ্ছবি থাকবে, প্রতিটি বক্তব্যে থাকবে দায়বদ্ধতার ছাপ। যদি সেই জায়গায় পৌঁছানো যায়, তবে শুধু সমালোচনা নয়—আস্থা ও সম্মানের জায়গাও শক্তিশালী হবে।

জুবাইয়া ঝুমা, পিআর প্রফেশনাল

Latest stories