26 C
Dhaka
Tuesday, July 21, 2026
Homeমতামতবাংলাদেশ কি চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনতে পারবে?

বাংলাদেশ কি চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনতে পারবে?

Date:

Related stories

মাগুরার মহম্মদপুরে গ্রামীণ ব্যাংকে আগুন

মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় গ্রামীণ ব্যাংকের অফিসে আগুন লাগার ঘটনা...

গ্লোব জনকণ্ঠের সম্পদ নিলামে তুলছে জনতা ব্যাংক

গ্লোব জনকণ্ঠের সম্পদ নিলামে বিক্রির বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে জনতা ব্যাংক।...

দর্শক এখন ‘মৌ ভাবি’ বলেই ডাকেন: সুষমা সরকার

মঞ্চ, টেলিভিশন, সিনেমা ও ওটিটি—সব মাধ্যমেই সরব অভিনেত্রী সুষমা...

ব্যাপক ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের ২ অঞ্চল অন্ধকারে নিমজ্জিত

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের একটি অভিনব দিক হলো কিয়েভের জ্বালানি...

ভোটারের সই জাল, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল

কুড়িগ্রামে সমর্থক ভোটারের জাল সই জমা দেওয়ার অভিযোগে বিএনপি...

দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত বিশাল প্রান্তর। যেখানে গাছপালা তো নেই-ই, এমনকি ঘাসের অস্তিত্বও খুঁজতে হয়। কয়েক ফুট উঁচু কাদামাটির বাঁধ এলাকাটিকে অসংখ্য ছোট ছোট ব্লকে ভাগ করে রেখেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, ছোট-বড় অসংখ্য পুকুরের এক অন্তহীন জাল।

জোয়ারের সময় উপকূলীয় এ অঞ্চলের নদী-খাল কানায় কানায় পানিতে ভরে যায়। আবার ভাটায় সেই পানি ১০-১২ ফুট নেমে যায়। কিন্তু কাদামাটির বাঁধে ঘেরা ঘেরগুলোর ভেতরে আটকে থাকা পানি একই স্তরে আটকে থাকে। অর্থাৎ উপকূলীয় জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ সেখানে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ, লবণাক্ত পানি আটকে রেখে বাণিজ্যিকভাবে বাগদা চিংড়ি চাষ হচ্ছে এসব ঘেরে।

এখন যে ২১ হাজার একর জুড়ে চিংড়ির ঘের, সেটিই একসময়ের কক্সবাজার জেলার চকরিয়া সুন্দরবন। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এলাকাটি নানা দেশীয় প্রজাতিতে সমৃদ্ধ একটি প্যারাবন ছিল। এ বনের প্রধান প্রজাতিগুলোর মধ্যে ছিল সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, হেঁতাল, পশুর, ধুন্দল, হাওয়া, গোলপাতা প্রমুখ (বাংলাপিডিয়া ২০১২, ৩৩৩)। বনটি ছিল বাঘ, হরিণ, বুনো শূকর, বানরসহ নানা বন্যপ্রাণীর এক সমৃদ্ধ আবাসস্থল। চকরিয়া সুন্দরবনে মাছ ও প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো চিংড়িও প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত।

কিন্তু, সেসব আজ অতীত। কেবলই স্মৃতি।

বর্ষায় পুরো চকরিয়া সুন্দরবন জুড়ে বাগদা চিংড়ি (ব্ল্যাক টাইগার) চাষ হয়। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে এই ভূখণ্ড হয়ে ওঠে বিশাল এক লবণ মরুভূমি। যতদূর দৃষ্টি যায়, কেবল লবণের স্তূপ চোখে পড়ে। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশক থেকেই চকরিয়া সুন্দরবন ও এর আশেপাশের এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে লবণ চাষ হচ্ছে। তারও আগে লবণ উৎপাদনের জ্বালানি হিসেবে এই বন থেকে ব্যাপক হারে সুন্দরী গাছ কেটে নেওয়া হতো।

চকরিয়া সুন্দরবন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন। একসময় এর বিস্তৃতি ছিল প্রায় ৪৫ হাজার একর জুড়ে। বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ১৯০৩ সালে চকরিয়া রেঞ্জে ১৮ হাজার ৫০০ একরকে সংরক্ষিত বন এবং আরও ২ হাজার ৫২০ দশমিক ৪৫ একরকে রক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়। এর ফলে ১৯০৩ সালের পর চকরিয়া সুন্দরবনের মোট ২১ হাজার ২০ দশমিক ৪৫ একর এলাকা বন অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে আসে।

১৯২৯ সালে চকরিয়া সুন্দরবনের ৩ হাজার ৯১০ দশমিক ৪০ একর জায়গা বন বিভাগ থেকে অবমুক্ত করে ‘বদরখালী সমবায় কৃষি এবং উপনিবেশ সমিতি’র ২৬২টি ভূমিহীন পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে সমিতির সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০।

এ অঞ্চলে মানুষের বসতি গড়ে ওঠার পর থেকেই চকরিয়া সুন্দরবনের গাছ কাটা শুরু হয়। তবে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে এসে এই বন যে ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়ে, তার নজির আগে ছিল না। ওই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে, বাংলাদেশে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণ ঘটে এবং এই বনভূমিকে সম্পূর্ণভাবে চিংড়ির ঘেরে পরিণত করা হয়।

বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সম্পৃক্ততার আগেই এ এলাকায় জবর-দখল শুরু হয়েছিল। ১৯৭৭ সালে গিয়াসউদ্দিন নামে এক স্থানীয় প্রভাবশালী চিংড়ি চাষ, হাঁস পালন ও মাছ চাষের জন্য ৫৬৩ একর প্যারাবন ইজারা পান। পরে তিনি ইজারা নেওয়া জায়গার ম্যানগ্রোভ বন কেটে ফেলেন। মূলত, এ ঘটনার মধ্য দিয়েই চকরিয়ায় বন ধ্বংসের শুরু।

পরবর্তীকালে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণকে আরও ত্বরান্বিত করে। মৎস্য অধিদপ্তরের অধীনে কক্সবাজারের চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ অঞ্চলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকার ও বিশ্বব্যাংকের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৮ সালে কৃষি ও বন মন্ত্রণালয় চকরিয়া উপজেলার রামপুর মৌজায় ৫ হাজার একর জমি চিংড়ি চাষের জন্য মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করে। পরবর্তীতে, ১৯৮২ সালে কৃষি ও বন মন্ত্রণালয় আরও ২ হাজার একর এবং ১৯৮৭ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় ২১ দশমিক ৭৬ একর জমি মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে বরাদ্দ দেয়।’

মৎস্য অধিদপ্তর ১৯৭৮ সালে ৫ হাজার একর জমি ৩৯ জন চিংড়ি চাষিকে লিজ দেয়। এর ফলে ম্যানগ্রোভ উজাড় করে চকরিয়া সুন্দরবনকে বাণিজ্যিক চিংড়ির ঘেরে রূপান্তরের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এগিয়ে যায়।

চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ অঞ্চলের কর্মকর্তারা এত বড় আকারের জমির ইজারা নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করতে না চাইলেও মাতামুহুরি নদীর ওপারে, চকরিয়া সুন্দরবনের উত্তরে অবস্থিত বদরখালী ইউনিয়নের বাসিন্দাদের স্মৃতিতে এখনো সেই সময়ের কথা বিদ্যমান। তাদের ভাষ্য, ইজারা পাওয়া ব্যক্তিরা ছিলেন এলাকার বাইরের ধনী ও প্রভাবশালী মানুষ। তারা প্যারাবন পরিষ্কার করে সেখানে বাঁধ নির্মাণ করেন এবং জমিগুলোকে চিংড়ির ঘেরে পরিণত করেন।

জমির ইজারাপ্রাপ্তরা চিংড়ি চাষের জন্য প্যারাবন পরিষ্কার করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগান। বদরখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ সাদ্দালিয়া গ্রামের কৃষক নুরুল কাদের তাদেরই একজন।

কাদের জানান, মজুরির বিনিময়ে শ্রমিক হিসেবে তিনিও চকরিয়া সুন্দরবনের গাছ কাটার কাজে অংশ নিয়েছিলেন। ইজারাপ্রাপ্তদের একেক জন ১৫০ একর করে জমি পেয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমি দেড় থেকে দুই বছর চকরিয়া প্যারাবনে গাছ কেটেছি। আমরা দা-কুড়াল দিয়ে গাছ কাটতাম। পরে সেগুলো রোদে শুকাতাম এবং পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিতাম। এভাবে একেকটি প্লট পুরোপুরি পরিষ্কার করতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেত।’

জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনামলে (১৯৮৪–৮৫) সরকার বড় বড় প্লটগুলোর ইজারা বাতিল করে। এরপর বিশ্বব্যাংকের স্বল্পসুদে ঋণ প্রদানকারী শাখা ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) আর্থিক সহায়তায় ১৯৭৮ সালে প্রথম দফায় মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা ৫ হাজার একর জমিতে উন্নত চিংড়ি চাষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এ সময় এ জমি ১০ একর করে ৪৬৮টি প্লটে ভাগ করে চিংড়ি চাষিদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়।

একই সময়ে এডিবির অর্থায়নে ২ হাজার একর জমিকে ১১ একর করে ১১৯টি প্লটে ভাগ করে চিংড়ি চাষিদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ অঞ্চলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, আরও ৪৮ একর জমিতে একটি প্রদর্শনী চিংড়ি খামার এবং বাকি জমিতে অবকাঠামো ও বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।

সরকারিভাবে এসব চিংড়ির প্লট ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের জন্য বরাদ্দ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সুবিধাভোগীদের অনেকেই ছিলেন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক একাই ৩০টি প্লট, অর্থাৎ মোট ৩০০ একর জমির ইজারা পায়। একসময়ের চকরিয়া সুন্দরবনের মাঝামাঝি জায়গায় এখনো দাঁড়িয়ে আছে গ্রামীণ ব্যাংকের চারতলা বৃত্তাকার ভবন। ভবনের গায়ে ঝুলছে ‘গ্রামীণ মৎস্য ফাউন্ডেশন’-এর সাইনবোর্ড, যা চকরিয়ার ম্যানগ্রোভ বন থেকে বাণিজ্যিক চিংড়ির ঘেরে রূপান্তরের এক স্থায়ী স্মারক হয়ে আছে।

তবে চকরিয়া সুন্দরবনের পুরো এলাকা মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বন বিভাগের ৭ হাজার একর জমি ডি-রিজার্ভ করে মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর ৬৪০ একর জমি ভূমিহীন কৃষক সমিতির কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ ছাড়া, ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে আরও ৫৬৩ দশমিক ৮৪ একর জমি চিংড়ি চাষের জন্য ইজারা দেওয়া হয়।

তবে এসব বরাদ্দকৃত জমির সীমানা কখনোই সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। এই সুযোগে ইজারা দেওয়া জমির আশেপাশের বনভূমিও একের পর এক দখল হতে থাকে। বন বিভাগ সেই দখল ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। তাদের চোখের সামনেই ধাপে ধাপে বিলীন হয়ে যায় ঐতিহাসিক চকরিয়া সুন্দরবন।

এক সময়কার ২১ হাজার একরের চকরিয়া সুন্দরবনের মধ্যে বর্তমানে ৪ হাজার ২২৭ একর উপকূলীয় বন বিভাগের আওতাধীন। সেখানে নদীর তীর ও খালের ধারে এখনো কেওড়াসহ কিছু ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ টিকে আছে। কিন্তু, হারিয়ে যাওয়া চকরিয়া বনের বাকি অংশ কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের আওতায় পড়েছে, যা সম্পূর্ণভাবে বেদখল হয়ে গেছে। একসময়ের সেই বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রে এখন কার্যত কোনো প্রাকৃতিক বনজ উদ্ভিদ অবশিষ্ট নেই।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ এবং তাদের নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘চকরিয়া সুন্দরবন: যে বনে গাছ নেই’-এ উপস্থাপিত তথ্যপ্রমাণ জোরালোভাবে দেখায় যে, বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষই এই চকরিয়া সুন্দরবন ধ্বংসের প্রধান কারণ। যদিও শুরুতে বিশ্বব্যাংক এ দাবি অস্বীকার করেছিল।

ম্যানগ্রোভ বন বিশ্বের অন্যতম উৎপাদনশীল ও দুর্যোগ-সহনশীল বাস্তুতন্ত্র। এটি স্থল ও সমুদ্রের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সংযোগস্থল তৈরি করে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় উপকূলের জোয়ার-ভাটা অধ্যুষিত এলাকায় বেড়ে ওঠা এই বন উপকূলকে ভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও ঢেউয়ের আঘাত থেকে রক্ষার পাশাপাশি উপকূলীয় পলিমাটিকে স্থিতিশীল রাখে। ম্যানগ্রোভের জটিল শিকড়-জাল মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, ঝিনুক, পাখি এবং অসংখ্য জলজ ও স্থলজ প্রাণীর প্রজনন, বেড়ে ওঠা ও খাদ্য সংগ্রহের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। ফলে এই বন সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য, উৎপাদনশীল মৎস্যসম্পদ ও উপকূলের লাখো মানুষের জীবিকা টিকিয়ে রাখতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।

গাছের উচ্চতা, জটিল বনকাঠামো ও সমৃদ্ধ ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদবৈচিত্র্যের জন্য খ্যাত চকরিয়া সুন্দরবন একসময় বিশ্বের অন্যতম সেরা ম্যানগ্রোভ বন ছিল। খর্বাকৃতির অল্প কয়েকটি প্রজাতির ম্যানগ্রোভ বনের বিপরীতে চকরিয়া সুন্দরবন ছিল নানা প্রজাতির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের সমৃদ্ধ সমাবেশ। অনুকূল পরিবেশে এখানকার পরিণত গাছগুলো অস্বাভাবিক উচ্চতায় বেড়ে উঠত। এই অনন্য বাস্তুতান্ত্রিক সমৃদ্ধিই চকরিয়া সুন্দরবনকে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় বনে পরিণত করেছিল।

এটি ছিল বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল, উপকূলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ, মৎস্যসম্পদের অন্যতম ভিত্তি এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন সঞ্চয়ের একটি প্রাকৃতিক ভাণ্ডার। এই অসাধারণ বনের বিলুপ্তি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিশ্বের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উপকূলে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের আশায় বারবার ম্যানগ্রোভ বন উজাড় হয়েছে। এর ফলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ঝুঁকির বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হারিয়ে গেছে। এর সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল রাতে আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়। ওই রাতে সৃষ্ট প্রবল জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলকে বিপর্যস্ত করে এবং প্রায় দেড় লাখ মানুষ প্রাণ হারায়।

এই বিপর্যয় স্পষ্ট করে দেয় যে, ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাস রুখতে ম্যানগ্রোভ বন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। চকরিয়া সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উপকূলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা বলয় হারিয়ে গেছে। ফলে আশপাশের এলাকাগুলো ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত মোকাবিলায় দুর্বল হয়ে পড়েছে।

নুরুল কাদেরের মনে এখনো দগদগে সেই ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের রাতের স্মৃতি। তিনি বলেন, ‘রাত ১০টার পরে বেড়িবাঁধ ভেঙে ঘরে পানি ঢুকতে থাকে। আমি, আমার বাবা-মা ও পরিবারের অন্য সবাই পানির তোড়ে ভেসে যাই। তখন আমার ছোট ভাই বাদলের বয়স মাত্র ৪ বছর। সে-ও পানিতে ভেসে যায়। পরে আমরা তার মরদেহ পাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘পানি প্রায় ৩০ ফুট পর্যন্ত উপরে ওঠে। চকরিয়ায় আগের মতো সুন্দরবন থাকলে এতো মানুষ মারা যেত না, এতো ক্ষতিও হতো না। সুন্দরবন জলোচ্ছ্বাসের সব পানি হজম করে ফেলতো।’

চকরিয়ায় বন হারিয়ে যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথা বলতে গিয়ে নুরুল কাদের আরও বলেন, ‘চকরিয়া সুন্দরবন না থাকায় আমরা এখন অনেক বেশি অসহায়। আমাদের জীবিকাও হারিয়ে গেছে। আগে নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করতাম। এখন চিংড়ির ঘেরগুলো বহিরাগত ধনীদের দখলে। সেখানে আমাদের ঢোকারও অধিকার নেই। নদী-খালে দু-চারটা মাছ ধরে কোনোমতে সংসার চালাই।’

চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনা সম্ভব কি?

চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারের পক্ষে ক্রমেই ঐকমত্য গড়ে উঠছে। বহু বছর আগেই এই বনের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারানো বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরও এই বন ধ্বংস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আক্ষেপ প্রকাশ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মনে করেন, পুরো ২১ হাজার একর এলাকাকে একটি একক, অবিচ্ছিন্ন বনভূমি হিসেবে সংরক্ষণ করা উচিত। একইসঙ্গে বিদ্যমান চিংড়ি ঘেরগুলোর ইজারা বাতিল করে পুরো এলাকাকে আইনগতভাবে বনভূমি ঘোষণা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

চকরিয়ায় কয়েক দশক ধরে লবণ উৎপাদন ও চিংড়ি চাষের কারণে মাটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হলে নির্মিত বাঁধগুলো অপসারণ করতে হবে অথবা ভেঙে দিয়ে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। জোয়ারের পানি নিয়মিত প্রবেশ শুরু হলে ৪-৫ বছরের মধ্যে মাটির লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। এর ফলে ধীরে ধীরে জমি তার প্রাকৃতিক পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য ফিরে পাবে। তখন ম্যানগ্রোভ প্রজাতি রোপণের মাধ্যমে বন পুনরুদ্ধার পরিবেশগতভাবে কার্যকর হয়ে উঠবে। এই পুনরুদ্ধারকালীন সময়ে প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই বাস্তুতন্ত্র পুনর্জীবিত করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—চকরিয়া সুন্দরবন আদৌ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে কি? কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তর হলো ‘হ্যাঁ’। তবে এর জন্য সরকারের একটি সুস্পষ্ট নীতি এবং তা বাস্তবায়নে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে।

চিংড়ি চাষের কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধারের সফল উদাহরণ রয়েছে থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে। এই দুই দেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ম্যানগ্রোভ বনকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে গাছ লাগানো নয়, বরং উপকূলের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৯০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত সময়ে থাইল্যান্ড তার প্রায় অর্ধেক ম্যানগ্রোভ বন হারায়। মূলত বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের কারণেই বন কেটে ফেলা হয়। কিন্তু রোগের প্রাদুর্ভাব, এসিড সালফেটযুক্ত মাটি ও পানির গুণগত মান নষ্টের কারণে অনেক চিংড়ির ঘের মাত্র ৫-১০ বছরের মধ্যেই অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক হয়ে পড়ে। এতে হাজারো হেক্টর জমিতে থাকা চিংড়ির ঘের পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখতে হয়।

থাইল্যান্ডে ফেলে রাখা চিংড়ি ঘেরের চারপাশের বাঁধ ভেঙে দিয়ে সেগুলোকে আবার জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ও পলি প্রবেশ করে ম্যানগ্রোভ পুনর্জন্মের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি হয়। যেসব এলাকায় স্বাভাবিকভাবেই ম্যানগ্রোভ পুনর্জন্মের সুযোগ ছিল, সেখানে প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই কাজ করে। অন্যদিকে, যেখানে তা যথেষ্ট ছিল না, শুধু সেসব স্থানেই দেশীয় ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ লাগানো হয়।

কমিউনিটিভিত্তিক ইকোলজিক্যাল ম্যানগ্রোভ রিস্টোরেশন (সিবিইএমআর) পদ্ধতির মাধ্যমে দেশটির স্থানীয় জনগণ এই বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। এর ফলে আরও সুস্থ ও সমৃদ্ধ ম্যানগ্রোভ বন গড়ে ওঠে, জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়, উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা জোরদার হয় এবং সামুদ্রিক নীল কার্বন সঞ্চয়ের সক্ষমতা বাড়ে।

একইভাবে, বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ফিলিপাইনও ব্যাপক আকারে ম্যানগ্রোভ বন উজাড় করে সেখানে মাছ ও চিংড়ির ঘের তৈরি করে। পরে দেশটি পরিবেশগত পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সরকারের সহায়ক নীতি ও স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণকে সমন্বয় করে ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়।

থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে যে, ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধারের প্রথম শর্ত ওই এলাকার প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এরপর যেসব স্থানে প্রাকৃতিকভাবে ম্যানগ্রোভ ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে সেই স্বাভাবিক পুনর্জন্মের সুযোগ নিশ্চিত করা। নতুন গাছ লাগানো হতে পারে একটি সহায়ক উদ্যোগ, কিন্তু বন পুনরুদ্ধারের মূল কৌশল নয়।

অর্থাৎ, প্রকৃতিকে তার নিজস্ব নিয়মে বন পুনর্গঠনের সুযোগ দিতে হবে। এতে ম্যানগ্রোভ বন নিজের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জন্মাতে পারে এবং চিংড়ি চাষে সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষতি ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠতে পারে।

তবে চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে পাহাড়সম বাধা। বেশকিছু বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এর মধ্যে অন্যতম হলো, চিংড়ি চাষের জন্য অব্যাহত আন্তর্জাতিক সমর্থন, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের তরফে।

১৯৮০-এর দশকে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সঙ্গে প্রণীত ও বাস্তবায়িত বিশ্বব্যাংকের সাড়ে ২৬ মিলিয়ন ডলারের (তৎকালীন প্রায় ৪৫ কোটি টাকা) চিংড়ি চাষ প্রকল্প ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। ফলস্বরূপ বিশ্বব্যাংক তাদের চতুর্থ মৎস্য প্রকল্প থেকে চিংড়ি চাষ-সংক্রান্ত অংশটি বাদ দেয় বলে জানা যায়।

পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাংক তার নীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। ২০১৮ সালে সংস্থাটি ২৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্প অনুমোদন করে। উপকূলীয় ১৪টি জেলায় বাস্তবায়িত প্রকল্পটি ২০২৫ সালের নভেম্বরে শেষ হয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মে–জুন মাসের ইমপ্লিমেন্টেশন সাপোর্ট মিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির অর্থ ছাড়ের হার ছিল ৭৯ দশমিক ১৪ শতাংশ। এই প্রকল্পের আওতায় ক্লাস্টারভিত্তিক চিংড়ি চাষ আরও সম্প্রসারণ করা হয়। মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে আমরা চকরিয়া সুন্দরবনের রামপুর মৌজায় চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাঁধ, স্লুইসগেটসহ বিভিন্ন অবকাঠামো দেখতে পেয়েছি।

চিংড়ি চাষে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক সহায়তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সংস্থাটি এখনো রপ্তানিমুখী চিংড়ি শিল্পকে উৎসাহিত করে চলেছে। এটা সত্য যে, চিংড়ি বাংলাদেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পণ্য এবং দেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই নীতিগত অবস্থান বিবেচনায় বলা যায়, দীর্ঘদিন চিংড়ি চাষকে সমর্থন করে আসা বিশ্বব্যাংকের মতো একটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিবে বা সেই লক্ষ্যে কার্যকরভাবে উৎসাহিত করবে—এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, মহেশখালী দ্বীপের দ্রুত শিল্পায়ন। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে সরকার ২০২৩ সালে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মাতারবাড়ী আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ সম্পন্ন করে। বঙ্গোপসাগরের কাছে কোহেলিয়া নদীর তীরে নির্মিত এই প্রকল্পের জন্য নদীর তীরবর্তী ম্যানগ্রোভ বন উজাড় করা হয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য সংযোগ সড়ক ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হয়।

এ ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় জনসাধারণের দৃষ্টির আড়ালেই থেকে গেছে। সেটা হলো, ৩০০ ফুট প্রশস্ত ও ৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ মাতারবাড়ী পোর্ট অ্যাক্সেস রোডের (পূর্ব অংশ) নির্মাণকাজ। এই সড়কটি চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের ফাঁসিয়াখালীকে বদরখালী ইউনিয়নের রামপুর মৌজার সঙ্গে যুক্ত করবে। একসময়ের ঘন ম্যানগ্রোভ বনভূমির স্থল, নদী ও খালের ওপর এই সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশ সরকারের মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের (সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর অংশ) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অস্ট্রেলিয়ার এসএমইসি, জাপানের পাডেকো এবং বাংলাদেশের ডেভকনের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম প্রকল্পটির নকশা ও নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর একটি ছিল প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মহেশখালী–মাতারবাড়ী এলাকাকে সিঙ্গাপুরের আদলে একটি বন্দর ও শিল্পকেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা। একই সময়ে জাপানও মাতারবাড়ীতে তাদের দ্বিতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ প্রকাশ করে।

বর্তমান সরকার যদি শেখ হাসিনা ও ড. ইউনূস সরকারের দেখানো পথ অনুসরণ করে, তাহলে চকরিয়া সুন্দরবনসহ মহেশখালী ও এর আশপাশের এলাকা ক্রমেই একটি আধুনিক বন্দর, শিল্প ও নগরকেন্দ্রে পরিণত হবে। সেক্ষেত্রে চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়বে।

চকরিয়া সুন্দরবন কারিগরি বিবেচনায় পুনরুদ্ধার সম্ভব। তবে সেটি বাস্তবে হবে কিনা, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তের ওপর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পর্যায়ক্রমে চিংড়ি চাষ থেকে সরে আসা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পরিবেশগত পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে হারিয়ে যাওয়া ম্যানগ্রোভ বন আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। যদি রপ্তানিমুখী চিংড়ি চাষ ও শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বর্তমান নীতি অব্যাহত থাকে, তাহলে একসময় দেশের অন্যতম মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারের সুযোগ স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে, সরকার ও বাংলাদেশ থেকে চিংড়ি আমদানিকারক দেশগুলো যদি সত্যিই চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধার ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আন্তরিক হয়, তাহলে প্রথমেই এ অঞ্চলের জোয়ার-ভাটানির্ভর প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। এরপর দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক ও পর্যাপ্ত অর্থায়নসমৃদ্ধ একটি পুনরুদ্ধার কর্মসূচি বাস্তবায়নের রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত করতে হবে।

 

ফিলিপ গাইন: গবেষক ও পরিচালক, সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড)।

ফাহমিদা রহমান: গবেষক, সেড।

Latest stories