29 C
Dhaka
Wednesday, April 8, 2026
Homeমতামতভর্তি পরীক্ষা: বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্যের দেয়াল

ভর্তি পরীক্ষা: বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্যের দেয়াল

Date:

Related stories

দারফুরের বাজারে ড্রোন হামলা, নিহত ১০

গৃহযুদ্ধে জর্জরিত সুদানের উত্তর দারফুর রাজ্যের একটি জনবহুল বাজারে...

বিএনপির রিল-মেকিং প্রতিযোগিতা, পুরস্কার তারেক রহমানের সাক্ষাৎ

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে 'আমার...

এস্তেভাও-কাসেমিরোর গোলে প্রথমবার সেনেগালের বিপক্ষে জিতল ব্রাজিল

সেনেগালের বিপক্ষে এর আগে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছিল ব্রাজিল।...

নারায়ণগঞ্জে পুলিশের অভিযানে আ. লীগের ২৯ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার, ককটেল-বিস্ফোরক উদ্ধার

কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের লকডাউন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে...

পৃথিবীর সঙ্গে ৪০ মিনিট যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকবেন নভোচারীরা, কী করবেন তখন

মানব ইতিহাসে পৃথিবী থেকে এখন সবচেয়ে দূরে অবস্থান করছেন...

‘বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা’ ও ‘ভর্তি পরীক্ষা’ শব্দবন্ধ দুটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি চরম বৈপরীত্য বা প্যারাডক্স তৈরি করেছে। একদিকে রাষ্ট্র আইন করে বলছে শিক্ষা সবার জন্য বাধ্যতামূলক ও অধিকার, অন্যদিকে নামী স্কুলগুলো ‘ভর্তি পরীক্ষা’র মাধ্যমে শিশুদের ছাঁটাই করার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের সংবিধান ও ১৯৯০ সালের আইন অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার।

প্রতিটি শিশুকে স্কুলে জায়গা দিতে রাষ্ট্র বাধ্য। অথচ ভর্তির পরীক্ষার মতো একটি ‘বর্জন প্রক্রিয়া’র মাধ্যমে শিশুকে শুরুতেই ‘যোগ্য’ ও ‘অযোগ্য’ এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হচ্ছে, যা বাধ্যতামূলক শিক্ষার মূল চেতনার পরিপন্থী।

বাধ্যতামূলক শিক্ষার লক্ষ্য হলো সামাজিক সমতা। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা এই সমতা নষ্ট করে। যে শিশু সচ্ছল পরিবারের এবং প্রি-স্কুল বা কোচিং করার সুযোগ পায়, তার ভর্তি পরীক্ষায় টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। অন্যদিকে, সুবিধাবঞ্চিত বা প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা পিছিয়ে পড়ে। ফলে বাধ্যতামূলক শিক্ষা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে তা ‘সুযোগভেদে শিক্ষা’য় পরিণত হয়।

ছয় বছর বয়সী একটি শিশুর মেধা যাচাই করার জন্য পেপার-পেন্সিল টেস্ট মনোবিজ্ঞান সম্মত নয়। বাধ্যতামূলক শিক্ষা হতে হবে আনন্দময়। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে শিশুরা শৈশবেই মানসিক ট্রমার শিকার হয়। পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়াকে তারা ব্যর্থতা হিসেবে দেখে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দিতে পারে।

তাহলে উপায়? বিদ্যমান লটারি প্রক্রিয়াও এ ক্ষেত্রে কোনো ভালো বিকল্প নয়। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাকে কার্যকর করতে হলে ‘স্কুল ম্যাপিং’ জরুরি। যেখানে প্রতিটি শিশু তার নিজ এলাকার স্কুলে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ভর্তি হতে পারবে। স্কুল ম্যাপিংয়ের উদ্দেশ্য হলো, কোনো এলাকার সব শিশু যেন তাদের বাড়ির হাঁটা দূরত্বের মধ্যে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পায়, তা নিশ্চিত করা।

যদি প্রতিটি এলাকায় মানসম্মত স্কুল থাকে, তাহলে অভিভাবকরা দূরের নামী স্কুলে ভর্তির পেছনে ছুটবেন না। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে ‘স্কুল ম্যাপিং’ একটি গেম-চেঞ্জার হতে পারে। উন্নত দেশগুলোর মতো একটি শিশু কেবল তার নিজ এলাকার স্কুলেই ভর্তি হবে। এতে যাতায়াত খরচ ও যানজট কমবে।

ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে চিহ্নিত করা সম্ভব, কোন স্কুলগুলো ‘পরিত্যক্ত বাতিঘর’-এর মতো পড়ে আছে এবং কোনগুলোর অতি দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। স্কুল যদি শিশুর ঘরের কাছে হয় এবং সেখানে যাওয়ার পথ নিরাপদ হয়, তাহলে ঝরে পড়ার হারও প্রায় শূন্যে নেমে আসবে।

গ্রামের সাধারণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রায় ১০০ শিশুর জন্য পাঁচ-ছয়জন শিক্ষক, যারা প্রায় সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অর্জন করেছেন এবং শিক্ষকতার জন্য প্রশিক্ষিত; চার-পাঁচটি শ্রেণিকক্ষ বিশিষ্ট বিদ্যালয় ভবন; একটি ওয়াশব্লক; অপরিসর খেলার মাঠ। কোথাও হয়তো যত্নের ছোঁয়া নেই। অপরিকল্পিত ও ঢিলেঢালাভাবে চলছে শ্রেণি কার্যক্রম। শিক্ষকদের দেখাদেখি শিশুরাও যে যার মতো করে বিদ্যালয়ে সময় পার করছে। কারো যেন কোনো লক্ষ্য নেই, গন্তব্য নেই, তাড়া নেই, নেই কোনো সময়াবদ্ধ নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা।

এসব বিদ্যালয়ে ক্যাচমেন্ট এলাকার শিশু জরিপ, হোম-ভিজিট, ক্লাস রুটিন, বার্ষিক পাঠপরিকল্পনা, বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা, এসএলআইপি পরিকল্পনা, ক্লাস্টার ও সাব-ক্লাস্টারভিত্তিক নানা কার্যক্রম সবই আছে। সবই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া পরিকল্পনার বোঝা। কিন্তু, ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের চাহিদা কিংবা স্থানীয় প্রেক্ষাপটের কোনো প্রতিফলন নেই। শিক্ষকরা কেবল নিয়ম মেনে চাকরি করছেন। কারো কোনো দায় নেই।

অথচ গ্রামে একটি নির্দিষ্ট এলাকার প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ তাদের সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য এই বিদ্যালয়ের ওপরই নির্ভরশীল। যে প্রাথমিক বিদ্যালয় হয়ে উঠতে পারত এলাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র, তা হয়ে থাকে এক পরিত্যক্ত বাতিঘর। সেজন্য এসব স্কুলে ভর্তি পরীক্ষাও প্রয়োজন নেই।

অন্যদিকে শহরে পাশাপাশি দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র দেখুন—একটি সরকারি আরেকটি বেসরকারি। বেসরকারিতে শিক্ষার্থীর মাসিক বেতন হাজারও ছাড়িয়ে যায়, বিদ্যালয়ের হয়তো নিজস্ব ভবন নেই, অনেক জায়গায় শিক্ষকদের সার্বিক যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কিন্তু সেখানে সন্তানদের ভর্তি করতে অভিভাবকদের ভীষণ তাড়া। অন্যদিকে সরকারি বিদ্যালয়ে নিজস্ব ভবন, প্রশিক্ষিত শিক্ষকসহ রাষ্ট্রের বহুবিধ আয়োজন থাকলেও নেই কেবল মানুষের আস্থা। তাই এখানে শিক্ষার্থীর ভিড় নেই, ভর্তি পরীক্ষাও নেই।

সরকারি বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। অভিভাবকরা নিজের করের টাকার এমন অপচয় মেনে নিয়েও সন্তানকে বেসরকারিতে উচ্চ বেতনে পড়াচ্ছেন। কিন্তু কেন? কেন সরকারি বিদ্যালয়ে আস্থা নেই? সবকিছু বিনামূল্যে দিয়েও কেন আস্থা ফেরানো যাচ্ছে না? বেসরকারির এতো কদর কেন?

এসব প্রশ্নের জবাব মিলতে পারে সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনার দিকে তাকালে। বেসরকারি বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক বিবেচনায়। সেজন্য শুরুতেই তারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিক্ষার চাহিদার প্রতি নজর রেখে নিজেদের শিক্ষাদানের কৌশল ও পরিচালনার নীতি ঠিক করেছে। নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে তারা শিখে নিয়েছে শিক্ষা-বাণিজ্যের বাজার ধরার চমকপ্রদ কলাকৌশল! ফলে তারা ক্রমেই নিজেদের বাজার সৃষ্টিতে সফল।

অন্যদিকে সরকারি বিদ্যালয়ে নিজেদের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার মুখাপেক্ষী হয়ে নির্বিকার সময় কাটায়। স্থানীয় চাহিদার আলোকে শিক্ষাক্রমকে পূনর্বিন্যস্ত করা কিংবা বিদ্যালয়কে কার্যকর করার নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের তাগিদ তাদের নেই। ফলে বিদ্যালয়টি ক্রমেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রমকে স্থানীয় চাহিদার আলোকে পুনর্বিন্যাস করার সুযোগ ও সক্ষমতা যদি বিদ্যালয় কিংবা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের না থাকে, তাহলে সেই ব্যর্থতার জন্য তাদেরকে দায়ী করা চলে না। আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও একমুখী প্রাথমিক শিক্ষার কথা ভাবছি। কিন্তু একমাপের জুতো সবার পায়ে লাগে না—এই সহজ যুক্তিটা দূরে সরিয়ে রাখছি!

মানছি, আমাদের প্রতিটি বিদ্যালয়ের সামর্থ্য নেই জাতীয় শিক্ষাক্রমের আলোকে নিজস্ব পরিকল্পনা গ্রহণের। কিন্তু উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে তো একটা বাস্তবায়ন কাঠামো আছে। তাদের কাজ কী? প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট কি কেবল চাপিয়ে দেওয়া বোঝা বহন করে শিক্ষকদের কাঁধে তুলে দিয়ে যাবে? উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টারেরই বা কাজ কী? প্রতিটি ক্লাস্টারে একজন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রয়েছেন। তারই বা কাজ কী? সবাই কি কেবল ভারবাহী?

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই ভালো জানেন, তার শিক্ষার্থীর শিখন-চাহিদা কী এবং কীভাবে শেখালে তার শিশুরা ভালো শিখবে। তার জানা ভুল হলে শুধরে নেওয়ার পথ বলে দিন। কিন্তু তার চেয়ে আপনি ভালো জানেন, এমন কথা বলে নিজেকে হাস্যকর করে তুলবেন না। যিনি শ্রেণিকক্ষে কোনোদিন পাঠদান করেননি, তিনি যখন শিক্ষককে উপদেশ কিংবা নির্দেশ দেন, তখন সেই কৃষিবিদের কথা মনে পড়ে যিনি খেতের আইলে বসে কৃষককে উপদেশ দিতে গিয়ে কৃষকের পরিহাসের পাত্র হয়েছিলেন। আমাদের ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞান থাকলেও আমরা হয়তো বুঝতে পারতাম, শিক্ষকদের প্রতি আমাদের অবহেলার মাত্রা কতখানি!

গত কয়েক দশকে প্রাথমিক শিক্ষায় বেসরকারি উদ্যোগ, মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেনসহ নানা বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্রমেই উপযোগিতা হারিয়েছে। কিন্তু তা নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয়নি।

নানা অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। সেজন্য আমাদের প্রত্যাশা শিক্ষা ক্ষেত্রে বিদ্যমান অরাজকতার অবসানে উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশেষত প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে চলমান উদাসীনতার অবসান হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বিদ্যালয়গুলোর সংস্কার উদ্যোগ না নিয়ে শিশুদের ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে নামী বিদ্যালয়ে ভর্তি করার মতো অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত শিশুশিক্ষার ব্যাপারে সরকারের উদাসীনতাকেই প্রকট করে তুলছে। আর শক্ত হচ্ছে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্যের দেয়াল।

জগজ্জীবন বিশ্বাস, শিক্ষাকর্মী
[email protected]

Latest stories