মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী এআই সিস্টেমের উন্নয়ন সাময়িকভাবে ধীর করা বা বিরতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সর্বাধুনিক এআই মডেলগুলো এমন কিছু লক্ষণ দেখাতে শুরু করেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ভবিষ্যতে এগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এএফপি জানিয়েছে, সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক এআই কোম্পানি অ্যানথ্রোপিক ইতোমধ্যে ক্লড নামের এআই মডেল তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন বিশ্বব্যাপী ধীরগতির করা হলে তা মানবসমাজের জন্য উপকারী হতে পারে।
তবে কেবল একটি কোম্পানি উন্নয়ন থামালে প্রতিদ্বন্দ্বীরা এগিয়ে যাবে বলেও সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আমরা মনে করি, সমাজের কাঠামো ও এআইকে মানবস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার গবেষণা যেন প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে, সেজন্য অত্যাধুনিক এআই উন্নয়ন ধীর বা সাময়িকভাবে স্থগিত করার সুযোগ থাকা বিশ্বের জন্য ভালো হবে।’
অ্যানথ্রোপিকের মতে, কার্যকর বিরতি বাস্তবায়ন করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ একাধিক দেশের বড় এআই কোম্পানিগুলোকে একই সময়ে উন্নয়ন বন্ধে সম্মত হতে হবে। পাশাপাশি এমন নিয়ম থাকতে হবে, যার বাস্তবায়ন যাচাই করা সম্ভব।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, বৈশ্বিক সমন্বয়ের কোনো ব্যবস্থা না থাকলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে কোম্পানি ও সরকারগুলোকে প্রতিযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্যেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তবে এ ধারণা প্রযুক্তি খাতের অনেকের কাছে জনপ্রিয় নাও হতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে, যাদের প্রতিষ্ঠানগুলো এআই প্রতিযোগিতার অগ্রভাগে রয়েছে। তার মহাকাশ প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের বহুল প্রতীক্ষিত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি তাকে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার বানাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অ্যানথ্রোপিকের এ অবস্থান নিয়ে ইতোমধ্যে শিল্পখাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এবং হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তার সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। তাদের মতে, সবচেয়ে খারাপ সম্ভাব্য পরিস্থিতির ওপর অতিরিক্ত জোর দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দেখাচ্ছে এবং নিরাপত্তার আড়ালে প্রতিদ্বন্দ্বীদের গতি কমাতে চাইছে।
তবুও হোয়াইট হাউস স্বীকার করেছে যে অ্যানথ্রোপিকের ‘মাইথোস’ মডেল অত্যন্ত শক্তিশালী। সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতার কারণে এটি সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি; বর্তমানে কেবল নির্বাচিত কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে এটি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
অ্যানথ্রোপিকের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। ওয়াশিংটন ও সিলিকন ভ্যালির অনেক নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তি নির্বাহী মনে করেন, এআই উন্নয়ন ধীর করলে চীন এ প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় কৌশলগত সুবিধা পেয়ে যেতে পারে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বেইজিং সফরের সময় চীনের সঙ্গে এআই নিরাপত্তা বিষয়ে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানান।
এ সপ্তাহে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশেও সই করেছেন, যার মাধ্যমে সবচেয়ে শক্তিশালী মার্কিন এআই মডেলগুলো প্রকাশের আগে সরকারকে ৩০ দিনের প্রাথমিক পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
‘মানুষের ভূমিকা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে’
অ্যানথ্রোপিক এ পরিস্থিতির তুলনা করেছে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির সঙ্গে। তবে তাদের মতে, এআই নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন, কারণ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির তুলনায় এআই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গোপন রাখা অনেক সহজ।
প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, ‘আপনার এমন একটি ব্যবস্থা দরকার, যেখানে প্রয়োজন হলে গতি কমানো বা থামানোর সুযোগ থাকবে। বর্তমানে এআই শিল্পের কাছে যেন শুধু অ্যাক্সিলারেটর আছে, কিন্তু ব্রেক নেই।’
অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, সরকার, বিজ্ঞানী, নাগরিক সংগঠন এবং প্রতিদ্বন্দ্বী এআই কোম্পানিগুলোকে নিয়ে আগামী কয়েক মাসে আলোচনা শুরু করবে তারা, যাতে এমন কোনো বৈশ্বিক ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর করা যায় তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।
প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, তাদের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী এআই এখন এআই উন্নয়নকেই উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুততর করছে। এর ফলে এমন একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তৈরি হতে পারে, যা গবেষকদের ভাষায় ‘রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’-এর দিকে নিয়ে যাবে।
এর অর্থ হলো, এমন একটি এআই ব্যবস্থা, যা মানুষের খুব কম সহায়তায় নিজেই নিজেকে আরও বুদ্ধিমান করে তুলতে সক্ষম হবে।
অ্যানথ্রোপিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আমরা এখনও সেখানে পৌঁছাইনি এবং রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট অবশ্যম্ভাবীও নয়।’
তবে প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করেছে, সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুত হওয়ার আগেই এ ধরনের সক্ষমতা বাস্তবে দেখা দিতে পারে।
প্রতিবেদনের ভাষায়, ‘এআই উন্নয়ন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে মানুষের ভূমিকা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।’

