24.6 C
Dhaka
Saturday, November 7, 2026
Homeবাণিজ্যসচেতনতার অভাবেই সাইবার প্রতারণার ঝুঁকিতে ক্ষুদ্র ব্যবসা

সচেতনতার অভাবেই সাইবার প্রতারণার ঝুঁকিতে ক্ষুদ্র ব্যবসা

Date:

Related stories

কড়াইলে ক্রাউডসহ সীমাবদ্ধতা প্রচুর, আগুন নেভাতে সমস্যা হচ্ছে: ফায়ার সার্ভিস

কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর কড়াইল বস্তির আগুন নেভাতে বেগ...

ওটিপি প্রতারণা থেকে বাঁচতে যে ভুলগুলো কখনো করবেন না

একটি ফোনকল। ওপাশ থেকে পরিচিত ভঙ্গিতে কেউ বলছে, ‘আমি...

ফিরেই বিটিএস চমক, এক সপ্তাহে ৪.১৭ মিলিয়ন কপি অ্যালবাম বিক্রি

দক্ষিণ কোরিয়ার কে-পপ ব্যান্ড বিটিএসের নতুন অ্যালবাম ‘আরিরাং’ মুক্তির...

ধর্ম দিয়ে বিভেদ সৃষ্টি করা একধরনের সুবিধাবাদ: মির্জা ফখরুল

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ধর্ম, গোত্র...

মিনেসোটায় ৫ শিশুকে আটক করেছে আইসিই

যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে দুই ও পাঁচ বছর বয়সীসহ অন্তত...

ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো ডিজিটাল পেমেন্ট ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর যত বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, সাইবার অপরাধীরা ততই তাদের অসচেতনতাকে ব্যবহার করে পাসওয়ার্ড ও অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো প্রতারণা করছে বলে এক গোলটেবিল বৈঠকে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সোমবার ঢাকার দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে গুগল ডট ওআরজির সহায়তায় দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন ও দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘স্ট্রেন্দেনিং সাইবার রিসিলেন্স ফর এমএসএমইএস: ট্যাকলিং ফাইন্যান্সিয়াল ফ্রড অ্যান্ড ইম্প্রুভিং গ্রিভ্যান্স মেকানিজম’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তারা জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার ও নীতিগত সংস্কারের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা বলেন, উন্নত প্রযুক্তির চেয়ে ডিজিটাল শৃঙ্খলার মৌলিক বিষয়গুলো মেনে চললেই অধিকাংশ প্রতারণা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

তিনি বলেন, প্রায় ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ আর্থিক প্রতারণা ঘটে পাসওয়ার্ড বা ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) শেয়ার করার কারণে। কোনো অবস্থাতেই এগুলো শেয়ার করা উচিত না। সাইবার নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বরং আচরণগত একটি চ্যালেঞ্জ।

তিনি আরও বলেন, নিরাপদ আর্থিক আচরণের অভ্যাস গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ে আর্থিক সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করেছে। পাশাপাশি ১৪ বছর বা তার বেশি বয়সী কিশোর-কিশোরীদের অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক লেনদেন আলাদা রাখা, দায়িত্ব অনুযায়ী কর্মীদের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার সীমিত করা এবং কোনো কর্মী চাকরি ছাড়লে সঙ্গে সঙ্গে তার ডিজিটাল প্রবেশাধিকার বাতিল করার পরামর্শ দেন তিনি।

এসএমই ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারজানা খান বলেন, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এমএসএমই) জন্য ডিজিটাল রূপান্তর এখন অনিবার্য। সেইসঙ্গে সাইবার সহনশীলতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, আমাদের এই পথেই এগোতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। এসএমই ফাউন্ডেশন উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল সাক্ষরতা ও ওয়েবসাইট উন্নয়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ জরুরি। কিন্তু, ওটিপি বা পাসওয়ার্ড শেয়ার করা যাবে না—এই সচেতনতাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা।

ক্ষুদ্র ব্যবসাকে আর্থিক প্রতারণা থেকে সুরক্ষিত রাখতে সমন্বিত সাইবার নিরাপত্তা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, প্রতারকরা প্রযুক্তিগত হ্যাকিংয়ের চেয়ে বেশি ব্যবহার করছে প্রতারণামূলক কৌশল।

ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. হাফিজুল ইসলাম বাবু বলেন, ভুয়া অর্থ পরিশোধের রসিদ, নকল ব্যবসায়িক পেজ এবং সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং করে অপরাধীরা প্রতারণা করে।

তিনি বলেন, একদিন সকালে যখন এক সন্দেহভাজনকে আটক করি, তখন তার অ্যাকাউন্টে ছিল ৩ হাজার টাকা। সন্ধ্যার মধ্যে তার অ্যাকাউন্টে টাকার পরিমাণ বেড়ে হয়ে যায় ৪০ হাজার টাকা।

এই উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখান, কীভাবে প্রতারণার মাধ্যমে খুব দ্রুত অর্থ সংগ্রহ করে অপরাধীরা।

তার মতে, প্রতারকরা আরও বেশি মানুষকে ফাঁদে ফেলতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পেজের প্রচারণায়ও অর্থ ব্যয় করে। চুরি হওয়া অর্থ সরিয়ে ফেলার আগেই সম্পদ জব্দ করতে সক্ষম একটি জাতীয় সমন্বিত সাইবার প্রতারণা অভিযোগ গ্রহণ সেল গঠনের আহ্বান জানান তিনি।

দ্য ফ্রন্ট পেজের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশক ফাসবীর এসকান্দার বলেন, সাইবার নিরাপত্তার মান ও কমপ্লায়েন্সে বাংলাদেশে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

বিদ্যমান ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, প্রতিটি ট্রেড লাইসেন্স বা নতুন ব্যবসার জন্য আলাদা ফোন নম্বর ব্যবহার করতে হয়। কেন?

তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার ও কার্যক্রম সীমিত করা সাইবার ঝুঁকি কমাতে অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি শক্তিশালী ডিভাইস নিরাপত্তা নীতি, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কমপ্লায়েন্স কাঠামো এবং বাধ্যতামূলক ডিভাইস নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ডিন মো. শাহজাদ হোসেন বলেন, হিউম্যান ইরর এখনো সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি।

আলোচনায় তিনি এমন একটি র‌্যানসমওয়্যার হামলার উদাহরণ দেন, যা একজন কর্মী ভুয়া অনলাইন বিজ্ঞাপনে ক্লিক করার পর ঘটেছিল।

তিনি বলেন, দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন ও গুগল ডট ওআরজির সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র গড়ে তুলেছে, যা ইতোমধ্যে এমএসএমই উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে।

ডিজিটাল ফরেনসিক ও তথ্য যাচাইয়ের জন্য একটি সাইবার ইন্টেলিজেন্স ল্যাব প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় সাইবার সহনশীলতা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি।

র‌্যাপিডের (রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট) নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ বলেন, উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরাও ভুয়া পরিচয় দেওয়া প্রতারকদের ফাঁদে পড়েন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার পরিচয়ে প্রতারকের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শুরুতে আমিও সন্দেহ করিনি।

অতিরিক্ত প্রশাসনিক সুরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে একজন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা সীমিত করার প্রস্তাবও দেন তিনি।

সিটি ব্যাংক পিএলসির ডিজিটাল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান সৈয়দ ইব্রাহিম সাজিদ বলেন, বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য ফাঁস হওয়ার কারণে প্রতারকদের জন্য অন্যের পরিচয় ব্যবহার করা সহজ হয়ে গেছে। ফলে তারা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই দ্রুত কৌশল বদলে ফেলতে পারে।

তিনি প্রস্তাব করেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকের মোবাইল নম্বর যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া উচিত। শুধু এই উদ্যোগই প্রতারণা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে পারে।

বৈঠকে উদ্যোক্তারা তাদের জীবিকা ও ব্যবসায় সাইবার প্রতারণার সরাসরি প্রভাবের কথা তুলে ধরেন।

বিউটি আক্তারের স্বামী এমএফএস এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। তাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বিউটি জানান, তাদের পরিবার নিয়মিত প্রতারণামূলক ফোনকল পেলেও এখন সতর্ক থাকতে শিখেছেন।

এসএমই উদ্যোক্তা শাহানা আক্তার জানান, হ্যাকাররা তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আপত্তিকর ছবি পোস্ট করেছিল, যা তার বিউটি পার্লারের ব্যবসায় বড় ক্ষতি করেছে। অন্য এক ঘটনায়, অনলাইন মেকআপ প্রশিক্ষণের জন্য অগ্রিম টাকা দিলেও সেই কোর্স আর হয়নি।

সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিউনিটি সাইবার৭১-এর প্রতিষ্ঠাতা তানজিম আল ফাহিম বলেন, অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা বড় ধরনের ক্ষতির পরই কেবল সহায়তা চান। সাধারণত দেখা যায়, নিরাপদ ব্যাকআপ না রাখার কারণে উদ্যোক্তারা পুরো ডিজিটাল অবকাঠামো হারিয়ে ফেলেন। তাদের পুরো ডেটাবেস হারিয়ে যায়। কোনো ব্যাকআপ থাকে না, এমনকি ডিজিটালভাবে নিরাপদ ব্যাকআপও থাকে না।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের আরেকটি সাধারণ ভুল হলো, অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পুরো কার্যক্রম একটি ফেসবুক পেজের ওপর নির্ভরশীল। অথচ তারা প্ল্যাটফর্মটির নীতিমালা সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না। উদ্যোক্তারা অনেক সময় সাময়িক বিধিনিষেধকে গুরুত্ব দেন না। ফলে, একপর্যায়ে তাদের ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

স্প্রীহা ফাউন্ডেশনের ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন ল্যাবের পরিচালক তাহসিন ইফনুর সাঈদ বলেন, অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসা ইতোমধ্যেই সাইবার ঝুঁকি কমানোর বাস্তবসম্মত উপায় গড়ে তুলেছে। ওষুধের দোকান ও অন্যান্য সেবাভিত্তিক ব্যবসা গ্রাহকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকে।

দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ইজলাল হোসেন বলেন, উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়া মানেই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়া। উদ্যোক্তারাই যদি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল শক্তি হন, তাহলে তাদের সুরক্ষা দেওয়া এবং সচেতন করে তোলা শুধু আমাদের দায়িত্ব নয়, অঙ্গীকারও হওয়া উচিত।

দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সেরাজ বলেন, এমএসএমইকে সাইবার হুমকি থেকে রক্ষা করতে হলে ডিজিটাল অগ্রযাত্রা থামিয়ে নয়, বরং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতার মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি অংশীজনদের প্রতি এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যেখানে উদ্যোক্তারা ডিজিটাল রূপান্তরকে গ্রহণ করার পাশাপাশি নিরাপদে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন।

তবে তিনি সাইবার ঝুঁকির কারণে উদ্ভাবন সীমিত করার পক্ষপাতি নন। এ বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, আমরা প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কোনো আপস করতে চাই না।

তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, নিরাপদ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়তে হলে শৈশব থেকেই সচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সাজিদা ফাউন্ডেশনের পরিচালক মো. নোমানুজ্জামান, বন্ডস্টেইনের পরিচালক মো. সাদেকুল আরেফীন, কারিগরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানিয়া ওয়াহাব এবং বিটিআরসির উপপরিচালক তাইফুর রহমান। গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন দ্য ডেইলি স্টারের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ বিভাগের প্রধান তানজিম ফেরদৌস।

Latest stories