29 C
Dhaka
Wednesday, September 30, 2026
Homeমতামতসার্বভৌম এআই: বাংলাদেশের যা করণীয়

সার্বভৌম এআই: বাংলাদেশের যা করণীয়

Date:

Related stories

অভ্যন্তরীণ নৌপথে বাড়ছে ফি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বাড়ার শঙ্কা

অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌপথে চলা যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের...

ট্রেইলার-গানে জমজমাট ঈদের ৬ সিনেমা

ঈদে মুক্তির ঘোষণা দেওয়া ছয়টি সিনেমাকেই প্রদর্শনের অনুমতি দিয়েছে...

নির্বাচনে অবশ্যই উদারপন্থা বেছে নিতে হবে: মির্জা ফখরুল

নির্বাচন হলে বিএনপি বিপুল ব্যবধানে জয় পাবে, সেজন্য একটি...

আবার চন্দ্রাভিযান, শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে নাসা

অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় পর চাঁদে মনুষ্যবাহী মিশন পরিচালনা...

পুরুষ ও নারী ফুটবলারদের বেতন-ভাতায় বৈষম্য কেন, প্রশ্ন হাইকোর্টের

পুরুষ ও নারী ফুটবলারদের মধ্যকার বেতন, সুবিধা ও সুযোগের...

১০ বছর আগের কথা। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল ‘ট্রান্সফরমার’ সিনেমাটা নিয়ে। সে ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় পড়ায়। তার কথা ছিল, পুরো সিনেমায় শুধু টিনের সঙ্গে টিনের সংঘর্ষের শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। মানে যন্ত্রে যন্ত্রে যুদ্ধ। মূল কথাটা ছিল অন্য জায়গায়—যন্ত্র একদিন ফ্রন্টিয়ারে চলে যাবে, মানুষ বসে থাকবে সাইডলাইনে। হাসি-ঠাট্টার মধ্যে কথাটা বললেও এখন টের পাচ্ছি হাড়ে হাড়ে।

পাঁচ বছর হলো ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছি। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের একটা বড় মাথাব্যথার নাম ‘ডিস্ট্রিবিউটেড ডিনায়াল অব সার্ভিস’, সংক্ষেপে ডিডস। বাইরের অনেকগুলো নেটওয়ার্ক থেকে একসঙ্গে অতিরিক্ত প্যাকেট ছুড়ে একটা সচল নেটওয়ার্ককে বসিয়ে দেওয়া যায়। সরকারে থাকতেও এই সমস্যা দেখেছি, কিন্তু এবার সরাসরি রেভিনিউতে টান পড়ায় রিসার্চে নেমে পড়লাম।

যারা এসব আক্রমণ চালায়, তারা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে, তখন মানুষের একার পক্ষে সেটা ঠেকানো কঠিন। আমরাও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিলাম। এমন সিস্টেম শতকরা ৮০ ভাগ কাজ নিজে সামলে দেয়, বাকিটুকু মানুষ টিউন করে নেয়। তখনই বুঝলাম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন তেল বা নিউক্লিয়ার অস্ত্রের মতো একটা কৌশলগত জিনিস, যেটা কেউ হাতছাড়া করতে চাইবে না। যার ফলাফল হিসেবে দেখছি, এই জিনিসের এক্সপোর্ট কন্ট্রোল নিয়ে দেশে দেশে টানাপড়েন শুরু হয়ে গেছে।

কয়েক মাস আগের একটা ঘটনা এই কথাটা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কমার্স ডিপার্টমেন্ট গত জুনে এক্সপোর্ট কন্ট্রোলের আওতায় অ্যানথ্রপিকের ফ্যাবল আর মিথস ৫ মডেলের ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সাময়িক বন্ধ করে দিয়েছিল। কয়েক সপ্তাহ পর নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হলেও এই কয়েক সপ্তাহেই বিশ্ব বুঝে গেল একটা জিনিস—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো জরুরি টুলের কিল-সুইচ যদি অন্য দেশের কোম্পানির হাতে থাকে, তাহলে যেকোনো সময় সেটা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এরপর থেকেই প্রায় প্রতিটা দেশ সার্বভৌম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে।

প্রশ্নটা এখন সহজ—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি ভাড়া করে চালানো যাবে, নাকি নিজেদের তৈরি করতে হবে?

ইউরোপ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে নিজেদের তৈরি প্যারিসের মিস্ট্রাল দিয়ে। ওপেন-ওয়েট এই মডেলকে তারা ধীরে ধীরে সাপোর্ট দিচ্ছে, লোকাল ডেটা সেন্টার থেকে চালানোর ব্যবস্থা করছে, যাতে মার্কিন সার্ভারের ওপর নির্ভরতা কমে। ভারত নিজস্ব মডেল আর ভাষিণীর মতো মাল্টিলিঙ্গুয়াল ডেটা প্ল্যাটফর্ম বানাচ্ছে, কারণ আমেরিকান মডেল আঞ্চলিক ডায়ালেক্ট বোঝে না। বাংলাদেশের মতো তাদের ‘কনটেক্সট’ বুঝতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে বাইরের মডেলগুলো। সিঙ্গাপুরও সি-লায়ন মডেল বানিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিজস্ব সংস্কৃতি আর ভাষার সূক্ষ্মতা রক্ষা করার চেষ্টা করছে।

এআই মডেল নিয়ে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আমি বুঝেছি, সিলিকন ভ্যালি বা চীনের বড় মডেলগুলো এসব দেশীয় কনটেক্সট ধরতে পারে না। কারণ, তারা তৈরি হয়েছে অন্য একটা দুনিয়ার ডেটা দিয়ে।

বাংলাদেশের অবস্থানটা এখানেই চিন্তার অবকাশ রাখে। সিলিকন ভ্যালির মতো কোটি কোটি ডলার খরচ করে শূন্য থেকে ফ্রন্টিয়ার মডেল বানানোর সামর্থ্য আমাদের নেই। আবার সিলিকন ভ্যালির মডেল বাংলা ভাষার সূক্ষ্মতা, স্থানীয় ইতিহাস, দেশীয় আইন—কিছুই বোঝে না। এর ওপর আছে নিরাপত্তার প্রশ্ন। রাষ্ট্রীয় গোপনীয় তথ্য, নাগরিকের ডেটা, কৌশলগত সিদ্ধান্ত বিদেশি সার্ভারে তুলে দেওয়া মানে বড় ধরনের ঝুঁকি নেওয়া। সরকার সম্প্রতি এই বিষয়ে নির্দেশনাও দিয়েছে যে, বাইরের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সিস্টেমে যেন গোপনীয় তথ্য না যায়। তার মানে সরকারও এখন এই কৌশলগত অস্ত্রটাকে দেশের কাজে লাগানোর কথা ভাবছে।

আমার মনে হয়, পথটা মাঝামাঝি জায়গায়। চাকা নতুন করে বানানোর দরকার নেই, লামা বা এই ধরনের শক্তিশালী ওপেন-ওয়েট মডেল বিনামূল্যেই নামিয়ে নেওয়া যায়। বরং জোর দেওয়া উচিত মানসম্পন্ন বাংলা ডেটাসেট তৈরিতে—আইনি নথি, ইতিহাস, সরকারি তথ্য, আঞ্চলিক ভাষার নমুনা।

সরকার এটা নিয়ে কয়েকটা বড় কাজ করেছে ইতোমধ্যে। ফলে এই ডেটা দিয়ে মডেলকে লোকালি ফাইন-টিউন করে বেসরকারি খাতে নিজস্ব ডেটা সেন্টারে চালাতে হবে, যাতে কোনো বিদেশি শক্তি চাইলেই বন্ধ করে দিতে না পারে। আমি ইচ্ছে করে বেসরকারি খাতের কথা বলেছি, কারণ সরকারের কাছে এ ধরনের কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত ‘ব্যান্ডউইথ’ নেই। সরকার ইতোমধ্যে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও এফডিআই নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, বরং বেসরকারি খাতকে যথার্থ প্রণোদনা দিলে এটা তারাই সমাধান করতে পারবে। সরকার প্রয়োজনমতো সেবা কিনবে। এটাই প্রথম ধাপ।

ডেটা যদি নতুন তেল হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তার ইঞ্জিন। এই ইঞ্জিন অন্য কারো গাড়িতে বসিয়ে যাত্রী হয়ে বসে থাকার সময় বাংলাদেশের নেই। প্রকৃত ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব মানে আমাদের ডেটা আমাদের সীমানার ভেতরেই থাকবে, আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মডেল সেটা প্রসেস করবে, আর সেটা চলবে আমাদের নিজের হার্ডওয়্যারে।

 

রকিবুল হাসান: টেলিকম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মানবিক রাষ্ট্র’ বইয়ের লেখক

Latest stories